রাঙামাটি ভ্রমণের গল্প, খরচ, খাবার, ইতিহাস ও ঐতিহ্য কথা।

রাঙ্গামাটি কে বলা হয় নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। রাঙ্গামাটির উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা, মিজোরাম, দক্ষিনে বান্দরবান, পূর্বে মিজোরাম ও পশ্চিমে চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ি। আয়তনের দিক থেকে রাঙ্গামাটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় জেলা। এ জেলায় চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, মুরং, বোম, খুমি, খেয়াং, চাক্, পাংখোয়া, লুসাই, সুজেসাওতাল, রাখাইন সর্বোপরি বাঙ্গালীসহ ১৪টি জনগোষ্ঠি বসবাস করে। ১৭৫৭-১৮৬০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাঙ্গামাটির নাম ছিল কার্পাস মহল। রাঙামাটি, বান্দারবান ও খাগড়াছড়ি -ও কার্পাস মহল এর অন্তর্ভুক্ত ছিল সে সময়। ১৮৬০ সালে কার্পাস মহ নাম পরিবর্তন করে পার্বত্য চট্রগ্রাম করা হয় এবং ১৯৮৫ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারী পার্বত্য চট্রগ্রাম কে ৩টি জেলায় বিভক্ত করা হয় যার ফলশ্রুতিতে রাঙ্গামটি জেলার সৃষ্টি হয়।

আজ আমরা ঘুরতে এসেছি প্রকৃতি আর নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি রাঙ্গামাটিতে। এখানকার ইতিহাস ঐতিহ্য, দর্শনীয় স্থান, খরচ ও খাবার সব কিছু নিয়েই আলচনা করব আজকের কলাম-এ।

রিলাক্স পরিবহন এর আরামবাগ কাউন্টার থেকে আমাদের যাত্রা শুরু রাত ১১.০০ টায় । গারি ভেদে ঢাকা থেকে রাঙ্গামাটির বাস ভাড়া ৬২০ টাকা থেকে ১৪০০ টাকা পর্যন্ত। আমরা রিলাক্স পরিবহন এর যে গাড়িটিতে উঠেছি এটাতে আমাদের জনপ্রতি ১১০০ টাকা করে খরচ হয়ছে। গন্তব্য সরাসরি রাঙামাটি শহরে। পথিমধ্যে আমাদের যাত্রা বিরতি ছিল কুমিল্লার ঢাকা চিটাগং হাইওয়েতে জমজম হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট -এ। রাতের এই সময়টাতে চিটাগংগামি গারিগুলো কুমিল্লার হাইওয়ে রেস্তরাগুলতে যাত্রা বিরতি দেয়। এ কারনে প্রত্যেকটি হাইওায়ে রেস্তরাতেই প্রচণ্ড রাস থাকে। As usual এখানেও যথেষ্ট রাস ছিল। আমরা ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে চা পান শেষে বাসে উথে পড়লাম।এরপর ঘুম… সকালে ঘুম ভাঙল গাড়ির সুপারভাইজার এর ডাকে। হোটেল এ এসে চেক ইন করে কিছুখন বিশ্রাম নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম সুন্দরের সন্ধানে।

Hotel এর lobby তে রাঙ্গামাটির দর্শনীয় স্থান আর বিষয়বস্তু গুলো ছবির গ্যালারীতে সাজানো ছিল। এখানকার দর্শনীয় বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে মনিপুরি নৃত্য, ঝুলন্ত সেতু, পলওয়েল পার্ক, রাঙামাটি বুদ্ধ মন্দির, শুভ্লং ঝর্না আর চক্ষু শিতল করা কাপ্তাই হ্রদ তো আছেই। চলুন বেরিয়ে পরা যাক…

আমাদের হোটেল থেকে ৫ মিনিটের পায়ে হাটা দুরেই নৌকার ঘাঁট। আগে থেকেই আমাদের ইঞ্জিন চালিত একটি নৌকা ভাড়া করা ছিল। আমরা মোট ১৩ জনের জন্য নৌকাটি ভাড়া করলেও নৌকাটিতে ২০ জন অনায়েশে ভ্রমন করতে পারবে। কাপ্তাই লেকে নৌকা যোগে পানিপথেই সবগুলো দর্শনিয় স্থানে যাওয়া যায়। তাই এখানে আপনারা পরিবার সহ আসলে সারাদিনের জন্য নৌকা ভাড়া করাটাই সাশ্রয়ী হবে। আমরা সারাদিনের জন্য নৌকাটি ভাড়া করেছি ২০০০ টাকায়। so জন প্রতি আমাদের সারাদিনের নৌকা ভাড়া পরবে ১৫৪ টাকা করে।

কাপ্তাই হ্রদ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের অন্তর্গত রাঙ্গামাটি জেলায় অবস্থিত একটি কৃত্রিম মানবসৃষ্ট হ্রদ। রাঙ্গামাটি শহরটি এই সুন্দর অপ্রতিরোধ্য লেক দ্বারা বেষ্টিত পাহাড়ী এলাকা। এটি পর্যটকদের জন্য একটি দুর্দান্ত পর্যটন স্পট। এই মনোমুগ্ধকর হ্রদের পিছনে রয়েছে এক বিরাট অন্ধকার ইতিহাস।

এই হ্রদ সৃষ্টির কারণ কাপ্তাই বাঁধ। এটি .১৯৫৭-১৯৬২ সালে সৃষ্টি হয়েছিলো কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের অংশ হিসাবে। যখন কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ নির্মাণ করে কৃত্রিম কাপ্তাই হ্রদ তৈরি করা হয়।

এই সুন্দর লেকের নীচে একসময় বহু আদিবাসীর বসবাস ছিল। কাপ্তাই বাঁধের কারণে হাজার হাজার একর জমি তলিয়ে যায়, আর আদিবাসীদের তাদের জমি, বাড়ি, ভবিষ্যৎ ও তাদের আশা হারাতে হয়েছে! এক লাখ মানুষকে উচ্ছেদ করা হয় এখান থেকে। এমন একটি মর্মান্তিক ঘটনা তাদের বাড়ি ছেড়ে উদ্বাস্তু হতে বাধ্য করেছিল।

ঢেউয়ের তালে তালে হেলেদুলে আমাদের নৌকা সুন্দর থেকে আর সুন্দর আর নিল থেকে নীলাম্বরীর দিকে ছুটে চলছে । এখন কাপ্তাই হ্রদের গহীনে আমরা। চোখ, মন, অন্তরাত্মা, শরীর সবকিছুতেই এক অপার্থিব প্রশান্তি বোধ করার মতো সৌন্দর্য। মাঝে মাঝে পর্যটক বাহি নৌকাগুলো চোখে পড়ছিল, কোথাও মাছ ধরার জেলে নৌকা। আর পুরোটা সময় জুড়ে অফুরন্ত সুন্দর নিল জলরাশি ভেদ করে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি শুভ্লং ঝর্নার দিকে। এখানে ২ টি ঝর্না আছে। একটির শুভ্লং বড় ঝর্না, আর আরেকটির নাম শুভ্লং ছোট ঝর্না।

কাপ্তাই লেকের ছোট ছোট দ্বিপ এর মতো ভিটাগুলোতে মানুষের বসবাস আর এরকম ছোট ভিটাগুলোতে পর্যটনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে খাবারের রেস্তোরা। এর মধ্যে ইয়ারিং রেস্টুরেন্ট মাচাং ও চাং পাং রেস্টুরেন্ট পর্যটকদের কাছে কাছে খুব জনপ্রিয়। কেন জনপ্রিয় সে বিষয়ে পরে আসছি। আগে চলুন আমাদের দুপুরের খাবারের অর্ডার করি। খাবারের অর্ডার এখানকার রেস্টুরেন্টগুলিতে ঝর্ণায় জাবার পথে আগাম করে যেতে হয়, নচেৎ দুপুরে উদরপূর্তি ছারাই দিন কাঁটাতে হবে…

খাবারের অর্ডার দেওয়া শেষ করে আমরা আবারো যাত্রা শুরু করি শুভ্লং বড় ঝর্নার দিকে।

ভারতের মিজোরামের লুসাই পাহাড় থেকে উৎপন্ন কর্ণফুলী নদী পার্বত্য চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রামের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশেছে। কর্ণফুলী নদীর উপর কাপ্তাই নামক স্থানে বাঁধ নির্মাণের ফলে কাপ্তাই লেক সৃষ্টি হয়েছে। এটিকে আমারা কাপ্তাই হ্রদ নামে চিনলেও এটি মূলত কর্ণফুলী নদিরই একটি অংশ।

হ্রদটি আশ্চর্যজনক প্রাকৃতিক দৃশ্যে পূর্ণ। রাঙামাটি শহরের বেশিরভাগ অংশ কাপ্তাই লেক দিয়ে ঘেরা। কাপ্তাই লেক ১১১২২ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত, গড় গভীরতা ১০০ ফুট (৩০ মিটার) এবং সর্বোচ্চ গভীরতা ৪৯০ ফুট (১৫০ মিটার)।

চারিদিকের মনোরম দৃশ্য দেখতে দেখতে আমরা পৌঁছে গেলাম শুভ্লং বড় ঝর্ণায়। এখানে জনপ্রতি ২০ টাকার প্রবেশ মুল্য পরিশোধ করে আমরা ঝর্নার নিচের দিকে নামলাম। বর্ষায় এই ঝর্নায় পর্যাপ্ত পানির প্রবাহ থাকে। শীতকাল শুরু হয়ে যাওয়ায় ঝর্নায় পানি কম এখন। এটিকে শুভ্লং বড় ঝর্না বলার কারন এর উচ্চতা। এই ঝর্নাটির উচ্চতা আনুমানিক ৩০০ মিটার।

শুভ্লং বড় ঝর্না ভ্রমন শেষে আমরা আবার ছুটে চলেছি আরেকটি ঝর্নার দিকে। এবারের যাত্রা শুভ্লং ছোট ঝর্নার উদ্দেশ্যে। আমাদের কাছে পুরো সময়টাই উপভোগ্য মনে হয়েছে। বিশেষ করে আলো, ছায়া, মেঘ আর কাপ্তাই লেকের সবুজ বনানির সংমিশ্রণে লেকের পানির সবুজ থেকে নিল, নিল থেকে অতি নীলে রূপান্তরটা আমি বেশি উপভোগ করেছি।
শুভ্লং বড় ঝর্না থেকে ছোট ঝর্ণায় পৌছাতে আমাদের সময় লেগেছে মাত্র ১০ মিনিট। এই ঝর্ণাটি উচ্চতায় ছোট হলেও পানির প্রবাহ ভালো ছিলো। ঝর্নার পানি দেখে আর লোভ সামলাতে পারলাম না। সদলবলে নেমে পড়লাম অবগাহনে।
ঝর্না বিলাসের পরে এবার আমাদের এবার আমাদের রেস্টুরেন্ট এ যাবার পালা। পেটে পুরদমে ইঁদুর দৌড়াচ্ছে। নৌকায় ওঠা মাত্রই লেকের বুকে ঝুম বৃষ্টি। কাপ্তাই এর সৌন্দর্য যেন আরো বেরে গেলো। বৃষ্টি আর মৃদু ঠাণ্ডা বাতাসের সাথে পাল্লা দিয়ে আমরা গিয়ে পৌছালাম আমাদের রেস্টুরেন্ট এ।

আমাদের অর্ডার করা খাবারগুলো প্রস্তুত ছিল। আমরা এখানে ভেজা কাপর পরিবর্তন করে উদরপূর্তিতে বসে পড়লাম। আমাদের অর্ডার করা খাবারগুলোর অধিকাংশই ছিলো আদি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী খাবার। কাচকি মাছের মচমচে ভর্তা, কাচকি মাছের ফ্রাই, কলা পাতার ভাপে লেকের রুই মাছের রেসিপি, ডাল… সবই অসাধারণ ছিল। প্রতি গ্রাসেই এখানকার খাবারের জনপ্রিয়তার কারন খুজে পাচ্ছিলাম। এক কথায় অসাধারন রন্ধন শিল্প…

খাবার শেষে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে আমরা ছুটলাম ঝুলন্ত ব্রিজ এর দিকে। বৃষ্টি না থাকলেও আকাশ এখনো মেঘাচ্ছন্ন। দূরে কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে তা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। ১৫-২০ মিনিটের যাত্রা শেষে আমরা পৌছালাম ঝুলন্ত ব্রিজ এর ঘাঁটে। কিন্তু পুনরায় বৃষ্টি নামতে শুরু করায় আর নৌকা থেকে নামা হলোনা। বৃষ্টি আর ঝড়ো বাতাসের কারনে পলওয়েল পার্ক এ আর নামা হলোনা। আমাদের আজকের ভ্রমণ সংক্ষিপ্ত করে আমরা ফিরে যাচ্ছি আমাদের হোটেল রুম এ…